
মুসলমানদের দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল ফিতর এবং ঈদ-উল আজহা। ঈদ এলেই ধনী-গরিব, কৃষক- শ্রমিকসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষদের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের আমেজ কাজ করে। সেদিক থেকে এবারে ঈদ-উল ফিতরের ঈদটা বেশ ভিন্ন। ২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো ঈদ উৎযাপন করতে যাচ্ছে দেশের মানুষ। তাই এ ঈদকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ধরনের উৎফুল্লতা ও ভাবনা কাজ করছে সকলের মধ্যে। রোজার শুরুতে ছুটি পেয়েই বাড়িতে ফিরে গেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা। বিভাগের পরীক্ষা, চাকরির পড়াশোনাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে এখনো ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী। তবে জুলাই বিপ্লবের পর প্রথম ঈদের ভাবনাতেও তাদের মাঝে ফুটে উঠছে দেশের চিন্তা, দেশের মানুষের চিন্তা। তাদের কথা গুলো শুনেছেন তালুকদার হাম্মাদ।
‘সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের মাধ্যম’
ঈদ অর্থ যে 'উৎসব' বা 'আনন্দ' তা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। নিঃসন্দেহে ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি একটি সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের মাধ্যম। সামাজিক সম্প্রীতি তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন এর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট যুক্ত থাকে।
স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর দেশের প্রথম ঈদ নিয়ে আশাবাদী হওয়া স্বাভাবিক, তবে দুঃখজনকভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। দুর্নীতি, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাট, সাইবার ক্রাইম এবং অনলাইন বুলিং যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের চলমান অরাজকতা থেকে মুক্তির জন্য শুধু একটি প্রফিশিয়েন্ট সরকারই যথেষ্ট নয়, বরং সবার অবিচ্ছিন্ন অংশগ্রহণও প্রয়োজন। নতুন বাংলাদেশে আসুক নতুন চিন্তাধারা, মুক্ত ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা, অধিকার সচেতনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে ঈদ কাটুক নানান আমেজে।
আতকিয়া আনজুম রিয়া, বিভাগ: লোক প্রশাসন, শিক্ষাবর্ষ:২০২২-২০২৩
‘সাম্যের শিক্ষা’
দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে আমাদের মাঝে আনন্দ ও উল্লাস নিয়ে। আমরা যারা বাড়ি থেকে দূরে থাকি তাদের ঈদ যেন সপ্তাহ খানেক আগেই চলে আসে যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নেই। চলমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শংকিত। নতুন বাংলাদেশে স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশে কোনো রকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ছাড়াই মানুষ তার ঈদযাত্রা করতে পারবে সেই প্রত্যাশা থাকবে। ঈদুল ফিতর সাম্যের শিক্ষা দেয়। দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সময় ধরে দেশে যে বৈষম্য হয়ে আসছিলো ঈদুল ফিতর এর শিক্ষা ধারণ করে সেই বৈষম্য দূর করে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সাম্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলবে তরুণ প্রজন্ম সেই প্রত্যাশা রাখছি।
তানিয়া হানিফ প্রমি, বিভাগ: আল ফিকহ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ, শিক্ষাবর্ষ:২০২২-২০২৩
‘কেউ ঈদের খুশি থেকে বঞ্চিত না হোক’
নতুন বাংলাদেশের প্রথম ঈদের সবাইকে অগ্রিম শুভেচ্ছা। ঠিক যেমনটা হয়েছিল ১৯৭২ সালের কোরবানির ঈদে। ২০২৫ এর এই রমজানের ঈদে গতবারের রমজানের চেয়ে অনেক বেশি পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি । মুক্ত গণ মাধ্যম থাকার কারনে আমরা ছোট থেকে বড় সব অপরাধ জানতে পারছি। সেই সুবাদে ই আমাদের মনে হচ্ছে অপরাধ আগে থেকে বেড়ে গেছে । যেহেতু সামনে ঈদ তাই বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেট চেষ্টা করবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করতে। এক্ষেত্রে সরকারের কাছে অনুরোধ, একটু নজর দিন যেন দেশের সকল শ্রেণীর মানুষ যেন ভালোভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করার জন্য যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। ধনী, গরিব সবাই যেন ভালোভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারে, কেউ যেন ঈদের খুশি থেকে বঞ্চিত না হয় । আমরা সকলেই চাই সকলের ঈদটা ভালোভাবে কাটুক। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকুক,কেউ যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয় সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
আলভির আহমেদ আহাদ, বিভাগ: সমাজকল্যাণ, শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২০২৩
‘একদিকে স্বাধীনতার স্বাদ অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা’
জুলাই বিপ্লবের পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদ আমাদের জন্য এক নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে স্বাধীনতার স্বাদ অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই দুই অনুভূতির দোলাচলে আমরা তরুণ প্রজন্ম দোদুল্যমান।
আমার প্রত্যাশা হলো, এই ঈদ হবে সত্যিকারের এক নতুন শুরুর প্রতীক। ফ্যাসিবাদী কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো, সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হবে। ঈদ মানে মিলন, সম্প্রীতি, আর উদযাপন। আমি চাই এই ঈদ জাতিকে বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যের পথে এগিয়ে নেবে।
তবে সংশয়ও কম নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ গঠনের চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থার মতো জটিল সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। আমরা কি সত্যিই স্থিতিশীলতার পথে এগোতে পারবো, নাকি পুরনো বিভেদ আমাদের আবারও টেনে নামাবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
তবে আমি আশাবাদী, কারণ তরুণ প্রজন্মের হাতে এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারবে সত্যিকারের এক সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথ তৈরি করতে। তাই এই ঈদ শুধু আনন্দের নয় নতুন বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিশ্রুতিরও।
মোঃ সজিব হোসেন, বিভাগ: হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষাবর্ষ: ২০২১-২০২২
‘আশার আলো ও বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যাশা’
নতুন বাংলাদেশের এই ঈদ শুধুই আনন্দ উদযাপনের দিন নয়, বরং এটি হতে পারে সকল প্রকার জুলুম, অন্যায় ও বৈষম্যহীন এক সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের দিন। প্রতি বছর ঈদ আসে, ঈদ যায়, কিন্তু এখনো এমন অনেক পরিবার আছে, যারা ঈদে দিনেও নতুন পোশাক কিনতে পারে না, শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না। ঈদের সকালেও অনেক ঘরে খাবারের নিশ্চয়তা থাকে না, মিষ্টি মুখ করাটাও তাদের জন্য স্বপ্নের মতো। নতুন বাংলাদেশে ঈদ শুধু এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি হবে সমাজ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির দিন। আসুন, আমরা শপথ করি—একটি সুবিচারভিত্তিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার।
রাজু আহমেদ জীবন, বিভাগ: আইন শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২০২৩
‘বিগত ৫০ বছর থেকে ভিন্ন’
জুলাই বিপ্লবের পর আমাদের প্রথম ঈদ। তাই এই ঈদ নিয়ে আমার মাঝে ভিন্ন উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা কাজ করছে। আশা করছি এই ঈদ বিগত ৫০ বছর থেকে ভিন্ন হবে। ঈদে শুধু এক শ্রেণীর মানুষের মুখে নয়,সকল শ্রেণীর মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষের মধ্যকার যে ঐক্য কিছুটা ব্যহত হয়েছে তা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির মাধ্যমে আবার ফিরে আসবে। সর্বপোরি, দেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের যে বিরল ধারা দেখা যাচ্ছে তা এই ঈদের মাধ্যমে আরও প্রসারিত হবে।
জায়েদ বিন ওসমান, বিভাগ: আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২০২৩
‘ইনক্লুসিভিটি বয়ে আনুক’
বছর ঘুরে আবার এসেছে ইদুল ফিতর। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই উল্লাস। নতুন বাংলাদেশের প্রথম ঈদ নিয়ে আমার ভাবনা অনেকটাই পরিবর্তিত এবং আধুনিক। কারণ দেশের উন্নয়ন, পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টি রেখে এবার আমরা ঈদ উৎযাপন করবো। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আমাদের মাঝে সৌহার্দ্য-সংহতির বার্তা বয়ে আনে। ঈদ মানে শুধুই দামি পোশাকে বিলাসীতা নয়, ঈদ মানে জাতি-বর্ণ-ধর্ম, সকল শ্রেনী-পেশা, দলমত নির্বিশেষে আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো। তাই আমাদের উচিত হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সাম্য, মৈত্রী, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। দেশের উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য, সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে যথাযথ ভাবা এবং দেশের প্রতি প্রেম ও দায়বদ্ধতার অনুভূতি আরও শক্তিশালী করা। সর্বশেষ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং গরীব-দুঃখীদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। তবেই ঈদ হবে আমাদের জন্য সুখ ও শান্তির।
মোঃ সাইফুল ইসলাম, বিভাগ: অর্থনীতি, শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২০২৩